কুমিল্লায় পবিত্র কুরআন অবমাননার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে দুর্গাপূজার মণ্ডপে হামলার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিভিন্ন ইউনিট। এক্ষেত্রে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দুটি বিষয়কে সামনে রেখে তাদের তদন্ত চলছে। প্রথমত, দেশের একাধিক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। দ্বিতীয়ত, তৃতীয় কোনো শক্তি। এছাড়া বিদেশি কোনো গোয়েন্দা সংস্থার ইন্ধন আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, তদন্ত যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে খুব শিগগির দায়ীরা গ্রেফতার হবে বলে আশা করছি। ইতোমধ্যে সন্দেহভাজন দু-তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রীতি বিনষ্ট করতেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এটি উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারও ইন্ধনে হয়েছে। এর সঙ্গে তৃতীয় কোনো শক্তিও জড়িত থাকতে পারে। আমরা অনেক কিছুই দেখছি, অনেক কিছুই অনুমান করছি। প্রমাণের অপেক্ষায় আছি। প্রমাণ পেলেই আপনাদের সামনে তুলে ধরব।

ঘটনাটি হঠাৎ করে ঘটার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ রয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে এটি আমরা আরও ক্লিয়ার করতে পারব। একটা নির্ভুল তদন্তের পর সব ঘটনা জানাব। মন্ত্রী বলেন, ‘শুধু কুমিল্লায় নয়; রামু, নাসিরনগরে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিই তাদের মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, আমাদের দেশের মানুষ ধর্মভীরু, ধর্মান্ধ নয়। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে কাদের লাভ হবে-আপনাদের কাছে সেই জিজ্ঞাসা আমার।’

সাম্প্রতিক ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন ও জড়িতদের গ্রেফতারে দফায় দফায় বৈঠক করছেন পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের হাইকমান্ডও বৈঠক করছে। রোববারও পুলিশ সদর দপ্তরে বিশেষ বৈঠক হয়েছে। হামলার সঙ্গে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করতে পুলিশের সবকটি ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হামলায় জড়িত সন্দেহে বেশ কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রতিমা ভাঙচুরের উসকানিদাতা ও হামলায় জড়িত শতাধিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছে পুলিশসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

পুলিশের একজন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা বলেন, তদন্তে ইতোমধ্যে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে এসব প্রকাশ করা যাচ্ছে না। ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও জানান, গুজব রটানোর অভিযোগে ফেসবুকের দুইশ’ এডমিনের প্রোফাইল কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তাদেরও আইনের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে পুলিশ। এমনকি কয়েকজনের ভয়েস বার্তাও পেয়েছে পুলিশ। তারা যাতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য সবকটি বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকায় কঠোর বার্তা পাঠানো হয়েছে।

কুমিল্লায় একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কুরআন শরিফ রাখার ঘটনার জেরে কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানের পূজামণ্ডপে হামলার ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ শনিবার রাতে ফেনীতে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ পর্যন্ত ৩৫টি পূজামণ্ডপে হামলা করে মূর্তি ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। মণ্ডপে হামলা প্রতিরোধ করতে গিয়ে হামলাকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে ৫ জন নিহত ও শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, হামলাকারী ও উসকানিদাতাদের ধরতে পুলিশের সব কটি ইউনিটকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার ও মেট্রো পুলিশ কমিশনাররা আলাদাভাবে বৈঠক করে নির্দেশনা পাঠাচ্ছেন থানার ওসিদের। পাশাপাশি সবকটি গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে আছে। হামলার আশপাশে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিমা ভাঙচুরে যারা অংশ নিয়েছে ওইসব ফুটেজ দেখে তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। আড়ালে থেকে যারা উসকানি দিয়েছে তাদের অনেককে শনাক্ত করা হয়েছে। শনাক্ত হওয়াদের পূর্ণাঙ্গ বায়োডাটা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) ফারুক আহমেদ বলেন, ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন ও মণ্ডপে হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনতে আমাদের জোরালো চেষ্টা চলছে। সর্বশক্তি দিয়েই তদন্ত চলছে। যারা মণ্ডপে কুরআন শরিফ রেখে গেছে তাদেরও ছাড় দেওয়া হবে না। যে কোনো পরিস্থিতি এড়াতে বাড়তি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে উসকানিদাতা ও হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন  বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে পূজামণ্ডপে হামলার সঙ্গে জড়িতরা শনাক্তের পথে। তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ফেসবুক ও ইউটিউবে ভুল তথ্য দিয়ে উত্তেজনা ছড়ানোর অভিযোগে ইতোমধ্যে ২০০ এডমিনকে শনাক্ত করা হয়েছে।

তাদের আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে। চাঁদপুর জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, বুধবার রাতে হাজীগঞ্জ পৌরসভার ত্রিনয়নী সংঘ শ্রী শ্রী রাজলক্ষ্মী নারায়ণ জিউর আখড়া পূজামণ্ডপে হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করতে ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। ওই ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, হামলাকারীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা।